31 December 2025 , 4:40:51 প্রিন্ট সংস্করণ
এক সময় গ্রাম বাংলার বিয়ে মানেই ছিল এক আলাদা আবেশ, এক আলাদা দৃশ্যপট। কনের বাড়ি থেকে বরকে আনতে কিংবা বর বাড়ি থেকে কনেকে নিতে যে বাহনটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ত, সেটি ছিল পালকি। আজ সেই পালকির বিয়ে আর নেই- থাকলেও আছে কেবল স্মৃতির পাতায়, গল্পের ভাঁজে কিংবা পুরনো দিনের হলুদ হয়ে যাওয়া আলোকচিত্রে।
গ্রামবাংলার পালকি ছিল শুধু যাতায়াতের বাহন নয়; এটি ছিল সামাজিক মর্যাদা, পারিবারিক ঐতিহ্য আর লোকজ সংস্কৃতির প্রতীক। কাঠের তৈরি পালকির গায়ে থাকত নকশা করা খোদাই, রঙিন কাপড়ে মোড়া ছাউনি, ভেতরে নরম বালিশ ও চাদর। চার কোণে চারজন শক্তপোক্ত পালকিবাহক কাঁধে তুলে নিতেন কনেকে। ঢাক, কাঁসর, শানাইয়ের সুরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলত বিয়ের শোভাযাত্রা।
পালকির বিয়েতে ছিল এক অনন্য শালীনতা। কনের মুখ দেখা যেত না সহজে; লাজুক পর্দার আড়ালেই থাকত সে। গ্রামপথের দু’ধারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষজন কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে দেখত সেই দৃশ্য। শিশুদের উচ্ছ্বাস, বয়োজ্যেষ্ঠদের দোয়া আর নারীদের আলাপচারিতায় মুখর হয়ে উঠত পুরো এলাকা। পালকিবাহকদের মুখে মুখে শোনা যেত ছড়া, গান আর রসিকতা-যা আজকের আধুনিক বিয়ের আয়োজনে একেবারেই অনুপস্থিত।
কিন্তু সময় বদলেছে। কাঁচা রাস্তার জায়গা নিয়েছে পাকা সড়ক, পালকির জায়গায় এসেছে মাইক্রোবাস, গাড়ি আর বিলাসবহুল সেডান। দ্রুততা আর আধুনিকতার দৌড়ে পালকির মতো ধীর, নীরব সৌন্দর্য হারিয়ে গেছে। আজকের প্রজন্মের অনেকে জানেই না পালকির বিয়ে কেমন ছিল, কেমন ছিল সেই যাত্রার আবেগ।
পালকিবাহকদের পেশাও হারিয়ে গেছে প্রায় সম্পূর্ণভাবে। একসময় যারা পালকি বয়ে সংসার চালাতেন, তারা এখন অন্য পেশায় বাধ্য হয়েছেন। পালকিও আর তৈরি হয় না আগেরমতোÑকারিগর নেই, চাহিদা নেই। শুধু কিছু জাদুঘর বা লোকজ মেলায় পালকিকে দেখা যায় নিদর্শন হিসেবে।
তবু পালকির বিয়ে আজও বেঁচে আছে স্মৃতিতে। গ্রামের বয়স্ক মানুষদের মুখে শোনা গল্পে, লোকগানে, কবিতায় আর সাহিত্যে। এটি আমাদের শিকড়ের কথা বলে, বলে ধীর জীবনের সৌন্দর্যের কথাÑযেখানে আনন্দ ছিল সরল, আয়োজন ছিল হৃদয়ের কাছাকাছি।
গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী পালকির বিয়ে হয়তো আর ফিরে আসবে না। তবে এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে মনে রাখা, নতুন প্রজন্মকে জানানো আমাদের দায়িত্ব। কারণ ঐতিহ্য ভুলে গেলে ইতিহাসও একদিন নীরবে হারিয়ে যায়Ñঠিক পালকির মতোই।





