অপরাধ বার্তা

কুমারখালীতে দুই বছর ধরে অভিনব কায়দায় চলছে রেলের জলাশয় দখল, নিরব কর্তৃপক্ষ

কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে রেলের জলাশয় দখল বন্ধে গেল দুই বছরেও কোনো পদক্ষেপ নেয়নি রেল কর্তৃপক্ষ। ফলে প্রথমে বালু দিয়ে ভরাট করে টিনের ঘর নির্মাণের পর এখন পাকা স্থাপনা তৈরির কাজও শুরু করেছে দখলদার। চারিদিকে টিন দিয়ে ঘিরে ভিতরে তড়িঘড়ি পাকা ভবন নির্মাণ করে এভাবে দখলদারিত্বের কাজ চলছে পৌরসভার বাটিকামারা-তেবাড়িয়া রেলগেট এলাকায়।

অথচ কয়েক বছর ধরে ভরাট ও ঘর নির্মাণের বিষয়টি রেল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদও প্রকাশ হয়েছে। তবুও টনক নড়েনি পাকশী রেলওয়ের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি বিভাগের কর্মকর্তাদের। আর স্থানীয় প্রশাসন বলছেন, ২০ জানুয়ারি অভিযান চালিয়ে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয়রা বলছেন, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই প্রকাশ্যে গাড়িভর্তি বালু এনে সরকারি জলাশয়টি ভরাট করা হয়েছে। টিনের ঘর নির্মাণের পর পাকা ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। তবে রেলের সংশ্লিষ্ট দপ্তর নিরব রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। কুমারখালী সরকারি কলেজ ও স্থানীয় সুত্রে জানা গেছে, কুমারখালী রেলস্টেশনের পূর্বপ্রান্ত থেকে বাটিকামারা রেলগেট পর্যন্ত এক একর ৩৪ শতাংশ অকৃষি ( জলাশয়), ২৯ শতাংশ কৃষি এবং ৩ হাজার ১০০ বর্গফুট বাণিজ্যিক রেলের জায়গা রয়েছে। যা ১৯৯৬ সাল থেকে কুমারখালী সরকারি কলেজের ইজারায় ও দখলে ছিল। কলেজ কর্তৃপক্ষ বর্তমানে প্রতিবছরে প্রায় এক লাখ টাকা খাজনা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় ২০২৪ সালে কলেজের সামনে অবস্থিত জলাশয়ের পূর্ব দিকে প্রায় ২০ শতাংশ জমি ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণের কাজ শুরু করে বাটিকামারা গ্রামের জাহিদ হোসেন। তিনি তরুন মোড় এলাকার মৃত বীর মুক্তিযোদ্ধা দীন মহম্মদ বিশ্বাসের ছেলে।

আরো জানা গেছে, বিষয়টি স্থানীয়রা রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিক সংবাদও প্রকাশিত হয়। তবুও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। তবে ২০ জানুয়ারি অভিযান চালিয়ে পাকা ভবন নির্মাণের কাজ বন্ধ করে দেন কুমারখালী সহকারী কমিশনার ( ভূমি) নাভিদ সারওয়ার। এরপর কিছুদিন বন্ধ থাকার পর আবারো শুরু হয়েছে নির্মাণ কাজ। শনিবার (৩১ জানুয়ারি) দুপুরে সরেজমিন দেখা যায়, কুমারখালী সরকারি কলেজ ও রেলপথেরর মাঝে বড় আকারের জলাশয় রয়েছে। জলাশয়ের পূর্বপাশে ভরাট করা হয়েছে। ভরাটকৃত জায়গার চারিদিকে টিনের বেড়া দেওয়া। প্রবেশপথে গেটে ঝুলছে তালা। আর ভিতরে অন্তত ৬ জন শ্রমিক পাকা ভবন নির্মাণের কাজ করছেন।

এ সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শ্রমিক বলেন, দুইতলা ফাউন্ডেশন দিয়ে ঘর নির্মাণ হচ্ছিল। কিন্তু সরকারি জমি হওয়ারয় কিছুদিন আগে এসিল্যাণ্ড এসে কাজ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। তবে জমির মালিক জাহিদের নির্দেশে আজ থেকে আবার কাজ চলছে। তার সঙ্গে কথা বলুন। অবিলম্বে পাকা ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধ করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে স্থানীয়রা বলছেন, রেলওয়ের মূল্যবান জলাশয়টি অবৈধভাবে ভরাট ও স্থাপনাদি নির্মাণের সঙ্গে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ থাকতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা। উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবীব চৌহান বলেন, প্রকাশ্যে সরকারি জলাশয় ব্যক্তিস্বার্থে ভরাট করা হচ্ছে। বিষয়টি দুঃখজনক। বিষয়টি একাধিকবার রেল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সংবাদও প্রকাশ হয়েছে। তবুও কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙেনি। এতো নৈরাজ্য মেনে নেওয়া যায়না।

কুমারখালী সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ বিনয় কুমার সরকার বলেন, রেলস্টেশনের পূর্ব প্রান্ত থেকে বাটিকামারা রেলগেট পর্যন্ত কৃষি ও কৃষি পুরো জমি কলেজের নামে লিজ নেওয়া ও দখলে ছিল। কিন্তু প্রভাবশালীরা ২০২৪ সাল থেকে জলাশয়ের একটি অংশ দখল করে প্রথমে ভরাট করে। এখন পাকা ভবননির্মাণের কাজ চলছে। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও রেল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েও লাভ হচ্ছেনা। এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত জাহিদ হোসেনকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে সম্প্রতি তিনি সমকালকে বলেছিলেন, কোনো অনিয়ম হচ্ছেনা। অন্যদের মতো তিনিও নিয়ম মেনে রেলের জলাশয় ভরাটের পর স্কুলের জন্য পাকা ঘর নির্মাণ করছেন। কিন্তু তিনি কোনো কাগজপত্রাদি দেখাতে পারেননি। রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম ফোনে বলেন, ‘কাজ কবে থেকে শুরু হয়েছে আবার? ঠিক আছে বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’ বলেই ফোনটি কেটে দেন। কুমারখালী সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাভিদ সারওয়ার বলেন, জমির শ্রেণি পরিবর্তন ছাড়াই জলাশয় ভরাটের সুযোগ নেই। প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্রাদি না থাকায় নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। যদি আবার পুনরায় কাজ শুরু হয়, তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।