বঙ্গবন্ধুর জন্ম শতবর্ষের শ্রদ্ধা মহাকালে এক মহামুক্তির কন্ঠস্বর

গৌতম কুমার রায়
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম,
জয় বাংলা।”
—–স্বাধীনতার ঘোষণা। এই কথাগুলো বলার সাহস যাঁর আছে তিনি কখনও মরতে পারেন না। বাঙালির যুগ যুগ সময় পার হয়ে গেলেও এই সাহসী বীরের কথা ভুলতে পারবে কেমন করে ? একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যার রক্তের মধ্যে যে অক্সিজেন শুদ্ধ ভাবে প্রবাহিত হয়েছিল, তার দৃঢ়চেতা কন্ঠ শক্তি এবং হুঙ্কার থেকে এসেছিল স্বাধীনতার নির্দেশিত বাণী। এই বজ্রবাণির ভাষণ ছিল সেই শক্তির পরিপূর্ণতার অবসম্ভ্যাবী প্রতিফলন।
ভারতীয় উপমহাদেশ বহু জাতি, বহু ভাষা, বহু সম্বন্ধের, বহুবিধ অর্থনীতির, বহুবিধ সংস্কৃতির,ঐতিহ্যের ও ইতিহাসের, শোষণ ও শাসনের, ব্যবসার, ভূগোল ও ধূসর এবং উর্বর মাটির দেশ। এই দেশে আসে আর্য, তুর্কি, মোঘল, আফগান, বৃটিশসহ আরো অনেক শাসক,শোষক গোষ্ঠি। যে কারণে এই বর্ষের মানুষ বারবার পরাধীনতার শেকলে পড়েছে। স্বাধীনতার যে স্বাদ তা আমরা অনেকটা ভুলে যেতে গিয়েই তা আদায় করেছিলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔপনিবেশিকেরা স্বাধীন হতে বিভোর হয়ে পড়ে। ভারতীয় উপমহাদেশে সেই স্বাধীনতা পেতে জাতি তত্তে¡রে তক্মা সামনে হাজির হলো। তার একটি হিন্দু অপরটি হলো মুসলিম। এই সময়ে যদি এই তক্মায় দেশ ভাগ না হতো তাহলে আজকে ভারত বর্ষের ইতিহাস হতে পারতো শক্তিশালী ও বিশ্বের অভিন্ন এক ভারতবর্ষ। যা হতো প্রগতির, উজ্জ্বল্যের. সুখকর ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ ইতিহাসের। সুখ, সম্পদের এবং বিশ্ব নেতৃত্বের ভারত বর্ষ। ১৯৪৭ সাল। ভারত ভেঙে এলো পাকিস্তান। পাকিস্তানের শাসকেরা ধর্মের বুলি আওড়িয়ে দেশ নিলেও তারা সময়ের ব্যবধানে সেই ধর্মকে ছুড়ে দিতে এতটুকু কুন্ঠিত হলো না। আসলে যারা ধর্ম ব্যবসায়ী তাদের কাছে ধর্মে ভেজাল মেশাতে সময় লাগে না। যেমনটা করেছিল এই শাসকেরা। তা-না হলে ৪৭’র জাত্ ভায়ের বুকে ৭১’এ এসে গুলি কেন ! কেন এই ভাইদের মা-বোনদের কে ধর্ষণ করতে হলো ? আসলে এই ধর্ম ব্যবসায়ীরা ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। এরা বাংলার মানুষকে নয় তারা চেয়েছিল আমাদের মাটি আর সম্পদকে লুট করতে। যে জন্য অনিবার্য হয়ে পরে একাত্তরের মহান মুকিÍযুদ্ধ।

৭ মার্চ ১৯৭১। এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণেই বাঙালি জাতি তার মুক্তির জন্য, জীবন বাজি রেখে, শত্রæ রুখতে যুদ্ধে যাওয়ার শক্তি পেয়েছিল।
ব্রিটিশের ধর্ম বা জাতি তত্তে¡¡ পাকিস্তানও চলতে লাগলো। অকর্মন্য এবং তথাকথিত দেশ নায়কেরা অজ্ঞ ও নির্বোধ বলেই শাসন পরিচালনায় নতুন নীতি বা কৌশল তাদের মাথায় আসেনি কখনও। বৃটিশ থেকে পাকিস্তান বা বাংলাদেশের শাসন এবং শোষণের নামে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন বোতলে একই মদ ব্যবহার করা হয়েছে। স্বাধীনতা আমাদের বারবার বৈষম্য, বঞ্চনা, ক্ষমতাহীন করে গেছে। যে জন্য আমরা স্বাধীনমুখী হয়েছিলাম তুলনামূলক বেশ পরে। দ্বি-জাতি তত্তে¡র তক্মায় ভারত আর পাকিস্তান তৈরী হলেও ৪৭’এ পাকিস্তানে আজো সে তক্মা রয়েই গেল। বরঞ্চ আগে জাতি ভেদ ছিল হিন্দু আর মুসলিমে, এখন তা হলো, হিন্দু-মুসলিমের পাশাপাশি পাকিস্তানি পাঞ্জাবী, খান নামের অবাঙালি এবং বাঙালিদের মধ্যে। তৈরী হলো জাতি স্বত্তার পৃথকের দেয়াল। যা কিনা প্রথমে কাদামাটির হলেও পরে তা হলো শক্ত ইট-পাথরের-কংক্রিটে শক্ত।

১৯৪৭ সাল হতেই পাকিস্তান নামের দেশ এবং তার শাসকদের কারণে যে বৈষম্য তৈরী হয়েছিল তা পূর্ব পাকিস্তানিদের জন্য ক্রমে ক্রমে পৃথক হয়ে পরার ইচ্ছে জোগায়। পরাধীনতার বিত্ত বৈভবের চেয়ে স্বাধীনতার অভাব অনেক ভাল। যেমন একাত্তরের আগের উর্দূর চেয়ে একাত্তরের পরের বাংলা অনেক সহজ এবং সাবলিল ও মধুরও। পাকিদের সিন্ধি গরুর দুধের স্বাদের চেয়ে আমাদের কালো গাভীর দুধ কত মিষ্টি এবং পুষ্টি-স্বাদের, এমনকি অধিক শক্তির তা কে-না জানে। ব্রিটিশ,পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ শাসনের নামে যত হুকুম এসেছে তা তালিম করে গেছে দেশের জনগণ। বাঙালিদের প্রতি অত্যাচারের প্রতিকার পেতে ফরিয়াদ করারও কোন জায়গা নেই, ছিলও না।
খাঁচার ব্যাঘ্র হওয়ার চেয়ে যদি মুক্ত বিড়ালকে আমরা দেখি তাও ভাল লাগে। কেননা মুক্ত বিড়াল প্রয়োজনে থাবা মারতে পারেবে। পাকিস্তানি জান্তাদের খাঁকী পোষাক এবং বন্দুকের চেয়ে, মুজিবের কালো কোর্ট এবং তার অঙ্গুলির নির্দেশনা এবং চোখের স্ফুলিঙ্গ অনেক অনেক শক্তিশালী। কোন দেশ এবং জাতি শুধু ধর্ম বিশ্বাস দিয়ে জোড়া লাগতে পারে না। এর জন্য দরকার সম্প্রীতি এবং প্রয়োজন আপন মহিমায় তার পথ তৈরী করে নেওয়া। যেটা পশ্চিম পাকিস্তানিদের অবিশ্বাসে বাঙালিরা করতে পেরেছিল।

যুগে যুগে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধে কিন্তু বাঙালি সব সময় সামনে ছিল। তবে ইউরোপ তার স্বাধীনতা পেতে যে সুযোগ সহজে পেয়েছিল ভারত তা পায় নাই। অবস্থা দৃষ্টে প্রমাণ ভারতে বাংলাকে ‘বাঙালি’ জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ ছিল। কিন্তু ঐ সময়ে এই বর্ষে যারা হানাদার এবং শাসক ছিলেন তারা কব্জা করে বাংলা এবং বাঙালির সম্পদ,শক্তি ও বুদ্ধিকে বারবার ব্যবহার করেছে ঠিকই তবে বাঙালির নেতৃত্বকে কখনই ব্যবহার করতে দেয় নাই। পাকিস্তানিরা জানতো যদি ধর্ম নামের কাল্পনিকতাকে প্রশ্রয় দেওয়া যায়, তবে তাতে নিজেদের আশ্রয় জুটবে কিন্তু জনতা এতে বুদবুদিয়ে থাকবে, জাগ্রত হবে না। এমনকি তীব্র অভাবে নিজেদের প্রয়োজনেও না।
একাত্তরে আমি বাঙালি হয়েছিলাম শুধু আমার স্বাধীনতার জন্য। আগস্ট ট্রাজেডি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি সমাজতন্ত্র এবং ধর্ম নিরপেক্ষতাকে বিসর্জন দিয়ে গেছে। আর এই বিসর্জনকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তখনকার তথাকথিত নির্বাচিত সরকারের কেও কেও।এই নির্বাচিতরাও পাকিস্তানি ভাবধারা থেকে দূরে থাকতে পারেন নাই। বরঞ্চ অনির্বাচিতদের ¯্রােতে এদের অনেকেই হয়েছেন সাম্প্রদায়িক ধার্মিক এবং পূঁজিপতিও। জনগণের জন্য সরকার, নাকি সরকারের জন্য জনগণ। ১৯৪৭ সালের উপলদ্ধি পরিবর্তনের জন্য সামনে আসে ১৯৭১ সাল। সময় বদলে ৭১ আসলেও তা কি বদলেছে ? এখন জনগণ আরো অনেক গোঁড়ামী, ধর্মতান্ত্রিকতায় ফিরেছে। যে জন্য আগেকার রাজাকার, এখন তাদের শক্তি শাণিত হয়েছে জঙ্গীবাদ বা ‘হাবল বদলে হয়েছে ছোবলে।’
যুদ্ধ জয়ের পরে মুক্তি যোদ্ধাদের তালিকায় রাজাকারদের নাম। তা রোধ করা যাচ্ছে না। তাহলে একটু ভাবুন রাজাকারদের শেকড় আজও কত দূর গেঁড়েছে। শয়তানেরা সব সময় ভোগবাদের হয়। তারা মরতেও জানে, আবার মারতেও জানে। সাম্প্রদায়িকতা এ দেশে সময়ের শাশ্বত। তা কখনও গোপনে আবার কখনও তা সন্মুখ সমরে। আমরা দুইবার স্বাধীনতা পেয়েছি তবে এই জাতিগত নষ্ট মনোভাবকে কখনও ত্যাগ করতে পারিনি। বরঞ্চ তা এমন প্রকট হয়েছে যে তা রাজাকার থেকে জঙ্গিবাদে প্রলেপ লেগেছে। দেশ থেকে তা ছড়িয়েছে বিশ্ব পরিমন্ডলে।

আদি সময় থেকেই দেশে কৃষক উৎপাদন করে চলে কিন্তু তা সে পরিপূর্ণ ভোগ করতে পারে না। উৎপাদক যদি গরীব হয় তবে সে দেশের গরীব প্রজা রাষ্ট্র্রের বা সরকারের কিভাবে অংশীদার হতে পারে ? ধূতির গীট ছিড়ে বৃটিশেরা পূঁজি পাঠিয়েছে শার্ট-প্যান্টের পকেটে। যা পাকিস্তানিরা করেছে পাঞ্জাবীর পকেট কেটে। উৎপাদকের ঘামের সাথে উৎপাদন বেঈমানি করে। কৃষকের হাড় ভাঙে তার উৎপাদন। শ্রম দিয়ে যে উৎপাদন হয় তার শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে শ্রম বিমুখ মানুষ। এই অধিকার হরণকারী ডাকাতেরা যুগের ধারায় মুনাফাখোর। তারাই স্বাধীনতার বিরোধী হয়েও বিনে শ্রমে অঢেল অর্থের মালিক হয়ে আজো স্বাধীনতার সুফলভোগী।
বারবার শক্তির হাতবদলে প্রাপ্ত যে স্বাধীনতা তা শ্রমশীল মানুষকে ফেলেছে বৈষম্য আর অধিকার বঞ্চনায়। যে কারণে নমনীয়তা, মানবিকতা নিষ্ঠুর প্রকট হয়েছে। সমাজ হয়েছে বন্ধনহারা বিবেকহীন। সে কারণেই মানুষের সভ্যতার আগে‘অ’ যুক্ত হয়ে তা হয়েছে অসভ্যতা। আগে দেশ শাসিত হতো ধর্মের ভন্ডামিতে এখন তা হচ্ছে তার সাথে পেশি শক্তিযুক্ত হয়ে, যুগে যুগে এবং অবৈধ পয়সার বিনিময়ে। ভালবাসা, শ্রদ্ধা, সাম্য, সংস্কৃতি সব কিছুতেই আজ ভিখেরির হাত পড়েছে।

২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীকার বিজয়ের জন্য যে স্বাধীনতা তা ৫০ বছরে পা দেবে। এই সময়ে দেশের মানুষের যে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন তা কি খুবই স্পষ্টতঃ ? আমরা ভাটি অঞ্চলের মানুষ হয়েও জলের আকালে চিৎকার করি। আমাদের অর্থনীতিতে বিধি নিষেধের বিধান। আমরা সামাজিক অনাচারে আবদ্ধ হয়ে গেছি। বিজ্ঞানের গতির সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়েছে দেশের দুর্নীতি। যেন প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে ঘুষকে, অন্যায় কে গ্রহণ করা হয়েছে। নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়েছি লজ্জাহীনতার কৌলিতত্বে। আমরা সাবলিলতা বুঝি না। আমরা অনুভূতিতে আঘাত হানতে ভালবাসি। আমাদের অসাম্প্রদায়িকতার বাঁশিতে সুর আসে না। আমরা শাসন করি নির্দয়তা দিয়ে। আমাদের বন গেছে, মন গেছে। আমরা এতটাই হিং¯্র যে পশুর প্রবৃত্তি এখন আমাদের কাছে হার মেনেছে। কি ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি! কেন আমরা মনোবিত্তে বৈষম্যকে মুছে দিতে পারি নাই। এখনও ‘মাইগ্রেট পিপল’ পকিস্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে স্বাধীন দেশে। ধর্মান্ধ (অ) মানুষ ছোঁয়াবে খোয়াব দেখে, হুর প্রাপ্তির স্বর্গ লাভের। মানচিত্র আমাদেরকে সীমানা দিয়েছে কিন্তু প্রাপ্তি আমাদেরকে নৈতিকতায় কলঙ্ক লেপে দিয়েছে। আমরা বিজ্ঞান বা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করি অনৈতিকতা দিয়ে। স্বাধীনতার ৫০ পড়ন্তে কোন মেয়ে নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন ভাবতে পারে না। সংখ্যালঘুরা এখনও ভোটে জয় পরাজয়ের সুখ-দুঃখের বলি হয়। গণতন্ত্র তাদের পরিবারে মা- মেয়েকে সম্ভ্রম রক্ষায় তটস্থ রাখে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার বাক্সে স্ক্রল দেখলে চোখে পরে হত্যা, অপহরণ, খুন,ধর্ষণের সংবাদ। ফাগুন গেলেও আগুণ নেভে না। বস্তির মানুষেরা তাই রাঙা মেঘেই ঘর ছাড়ে। যা ছিল পাকিস্তানীদের ২৪ বছরে শাসনের প্রতিদিন। যে জন্যই ৭১ ছিল অনিবার্য। জীবন বিসর্জন দিয়ে হলেও স্বাধীনতা আনো। যে স্বাধীনতায় আমাদের জীবন পরিপূর্ণতা পায়। ঠিক সেই স্বাধীনতা। তাইতো এমন সমাজ গঠণের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা লড়েছিলেন তাদের জীবনকে বাজি রেখে। হয় মুক্তি নয়তো মৃত্যু। এই জন্য আমাদের উজ্জীবন শক্তি আসে ৭ মার্চের উদ্বাত্ত আহŸান থেকে। যে আহŸান মহামতি ঐশ্বরিক এক চিরভাস্বর জাগতিক নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের। তার জন্ম শত বর্ষে তাই আমার লাল সেলাম।
লেখক:
প্রাবন্ধিক, উদ্ভাবক-গবেষক(জাবি,সাভার,ঢাকা) ও পরিবেশ ব্যক্তিত্ব (সরকারী খেতাব)।

Loading...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here