প্রকৃতি দুঃখ নাও-সুখ দিয়ে

গৌতম কুমার রায়: প্রকৃতি তার সৃষ্টিতে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য তৈরী করলেও সৃষ্টিগত কোন বিভদ সৃষ্টি করে না। তবে মানুষ তার আহার, শাসন, ধর্ম, রাজনীতি,ভাষা প্রভৃতি কারণে নিজেদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে। যে জন্য মানুষ কোথাও বিস্তর ভৌগলিক সীমায় অল্প, আবার কোথাও অল্প সীমারেখায় বিস্তর বসবাস করে আসছে। যেখানে সে অল্প সীমানায় অনেকে বসবাস করছে সেখানে প্রকৃতি ব্যবহার হচ্ছে নানা ভাবে। এতে প্রকৃতি ক্ষয় হয়ে পড়ছে দ্রæত। মানুষ এখানে বিশাল অভাবকে মোকাবেলা করতে গিয়ে যাচ্ছে-তাই প্রকৃতিকে ব্যবহার করার জন্য প্রকৃতির আক্রোশের শিকার হচ্ছে। আবার এই আক্রোশের প্রভাব গিয়ে পড়ছে তার সীমারেখার পার্শ্বে প্রাণিকূলের পরে। এতে অন্যরা প্রকৃতিকে লোভে ব্যবহার না করেও আক্রোশের আগুনে জ্বলছে ঠিকই। তবে তারা দোষে দৃষ্ট নয়।
মানুষের জন্য জমি বদলে যাচ্ছে। কৃষি জমি বৈশিষ্ট্য হারিয়ে অ-কৃষিতে চলে যাচ্ছে। দেশে প্রায় ৫ হাজার ইট ভাটা রয়েছে। যা থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি পিস ইট হয়। এই ইটের জন্য আনুমানিক ৯ হাজার কোটি টন মাটি কাটা পরে। আবার এই ইট তৈরী করতে গিয়ে আমরা হারাচ্ছি কৃষি জমির মূল্যবান ‘টপ সয়েল’কে। বন, টিলা, পরিবেশ সমূহকে। আমাদের পাহাড় টিকছে না। পাহাড় কেটে নেয়া হচ্ছে। ফলে তা ধ্বসে যাচ্ছে। যে খাড়া পাহাড় সূর্যের তাপ, বাতাস, প্রবল বৃষ্টিকে নিজের শরীরে নিয়ে প্রকৃতির ক্ষয় রোধ করতো, সেই পাহাড় ক্ষয়ে যাওয়ায় তাপের চাপে বাতাসে প্রচুর বালু ও মাটি বাহিত হচ্ছে। উপকূলে পলি জমে জলস্তর উঁচু হচ্ছে। নদী-নালা, সাগরের সঙ্গম পথ ভড়াট হচ্ছে। উজান জল¯্রােতে পলি ভেসে আসতে থাকায় নদী মরেছে। এতে ভয়ঙ্কর প্রভাবে পড়েছে আমাদের পরিবেশ। এসবের পেছনেও ক্রিড়ানক হিসেবে কাজ করছে আমাদের সীমিত সীমারেখায় বসবাসকারী অধিক জনসংখ্যা। যারা কিনা নিজেদের ভোগ বিলাসে প্রকৃতির সামান্য সম্পদের উপর হামলে পড়ছে অহরহ। বসত বাটি, রাস্তা-ঘাট, হাট-বাজার, স্কুল, মন্দির-মসজিদ করতে গিয়ে জমি বা মাটি টিকছে না। শিল্প ও বিদ্যুৎ, রাস্তা এবং যানবাহন গড়তে গিয়ে মাটি, জল, জলজ সম্পদ ও বায়ু টিকছে না। যানবাহন আমাদের নিঃশ্বাসের বিশ্বাসে আঘাত হেনেছে। আমরা বেঁচে আছি যেন ক্ষয়ে ক্ষয়ে। যে জন্য বলতে পারি,
‘ শরীরটাকে নদী ভেবে দেখ, জলের ধারা বটে,
কখনও তা উথাল- পাথাল, কখনও গড়ে ক্ষয়ে ক্ষয়ে।’
ইসলামাবাদ বা দিল্লি নয় আমাদের ঢাকা শহরের বাতাসও বিষে ভরা। এই শহরের জল গেছে, শব্দ গেছে, বায়ু গেছে, গাছ-মাছ-মাটি হারিয়েছে। এখানকার মানুষ নিত্য যে জল পান করে তাও নিরাপদ নয়। একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলেছে আগামী ২০৩২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই শহরে মানুষ চলতে গিয়ে পায়ে পায়ে বাধা পাবে। তবে এখনকার অবস্থা যে ভালো, তাও বলছি না। সীমিত বাতাস এবং পানি যে ভাবে প্রতিনিয়ত টেনে নিচ্ছি, তাতে সব সময় এই ঢাকার প্রায় ১.৫ কোটি মানুষ ঝুঁকির মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। ভাবতে গেলে মনে পরে যেন,

সময়ই বদলে দেয়, সময়ের সমস্ত সংলাপ
তবে এখন যেন বেঁচে আছি ¯্রফে বাঁচার খাতিরে।
আমাদের সমস্যা হলো, সমাজ বৈষম্যে ভরা। আমাদের নীতিবোধ এবং বিবেক নিয়ন্ত্রিত নয়। লোভ এবং তার জন্য ক্ষোভ বেশি কাজ করে। সরকার আইন করে, আমরা তা না-মানার জন্য প্রতিবাদ করি। আমরা আইন বাতিলের জন্য রাস্তায় নামি। ভাংচুর করি। আমাদের সীমিত কৃষি জমিতে নদী এবং বৃষ্টি সারা বছর রস যোগান দিয়ে উৎপাদনশীলতাকে জিইয়ে রেখেছে। আমরা হিমালয় সৃষ্ট পলি বাহিত এলাকার ভাটি অঞ্চলের মানুষ হলেও, আমাদের দেশের প্রবাহিত জলের ৯৩ শতকরা আসে সীমান্তের বাইরে থেকে, আর মাত্র ৭ শতকরা আমাদের অভ্যন্তরের। অথচ আমাদের লোকসংখ্যা বিস্তর। ভারতের নদী গবেষক ববি চন্দ্রের কথায় শুধু হিন্দুকুশের পাহাড়-পর্বতেই বসবাস করে প্রায় ২৪ কোটি মানুষ। আবার ভারতীয় উপমহাদেশের ১০ টি প্রধান প্রধান নদী নির্ভর করে বেঁচে আছে ২০০ কোটি মানুষ। যাদের জীবন যোগানের প্রয়োজনে অর্থনীতি, কৃষি, জলবিদুৎ তৈরীতে এই পর্বতের জলই শক্তি যোগাচ্ছে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে। আরেকটু ভাবলে দেখা মেলে, এই অঞ্চলের তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণে এই পর্বতের ভূমিকা রয়েছে। নিরাশার কথা হলো, ১৯৭০ সালের আগে ৫০ বছরের হিসেবে এই পর্বতের প্রায় ১৫ শতকরা বরফ গলে গেছে। অর্থাৎ ১৯০০ হতে ১৯৪০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বরফ গলেছে। সে জন্য এই এলাকার ঠন্ডার পরিমাণও কমেছে। একটি হিসেব দাবি করেছে প্রতি দশকে এই এলাকায় ১ টি ঠান্ডার রাত এবং ১.২ টি ঠান্ডার দিন যেমন কমেছে, আবার একই ধারায় ঐ সময়ে গরমে গড়ে ১.৭ টি রাত এবং ১.২ টি দিন বেড়েছে। আমােেদর দেশে দাবানলেরমত প্রাকৃতিক বিপর্যয় না থাকলেও আমাদের রয়েছে খরা এবং বন্যা। শৈত্য প্রবাহ এবং দাবদহ। এসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিষয় নিয়ন্ত্রিত না হলেও তার ক্ষিপ্রতা সৃষ্টিতে আমাদের বিস্তর ভূমিকা থাকে সব সময়। আমাদের বায়ু দূষণের ঘনত্ব এতটাই যে স্বাভাবিক নিয়মে ফুলের সৌরভ ১০-১২ শত মিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়, কিন্তু এখন সেই দূরত্ব কমে হয়েছে ২-৩ শত মিটার পর্যন্ত। ফুল কমে গেছে। পতঙ্গ কমেছে সঙ্গত নিয়মে মধু উৎপাদনও কমে গেছে। যার জন্যও মানুষ দায়ি। ১৯৯৪ সালে দেশে মধু উৎপাদন হয়েছিল ৪৩৭.৪৭৮ মেট্রিক টন। মাত্র চার বছর ব্যবধানে ১৯৯৮ সালে তার উৎপাদন ছিল ৩৯৩.৫০ মেট্রিক টন।
প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচূর্যতা থাকলে বাড়তি জন বসতি কখনও বোঝা হয় না। আবার শিল্পায়নের যুগে যদি শিল্প সমৃদ্ধ দেশ থাকতো তবে এই জন সংখ্যার প্রতি জনের দুটি হাতকে সক্ষম বা কর্মক্ষম করে গড়ে তোলা গেলে তা হতো আশির্বাদের। আমরা এখনও সেই পর্যায়ে দেশ এবং জাতিকে এগিয়ে নিতে পারি নাই। তবে সরকারের অদম্য যে চেষ্টা রয়েছে তাতে এই স্বপ্ন হয়তো সফল হবে। আমাদের ১.৮১ লাখ বর্গ কিলো মিটার সমুদ্র জলরাশির সাথে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মানচিত্রে পেয়েছি ১,৪৩,৯৯৮ বর্গ কিলো মিটার বাংলাদেশকে। সে লক্ষে বর্তমানে ১,৪৩,৯৯৮ বর্গ কিলো মিটার সেই মানচিত্রের আয়তনে লোক সংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গ কিলো মিটারে প্রায় ৮০০ জনের কিছু উপরে। আমাদের দেশে প্রতি ১০০০ জন লোক সংখ্যার ক্রুড বার্থ রেসিও বা সিবিআর জন্ম ৩৫.২ শতকরা এবং মৃত্যু ১০.৬ শতকরা, অর্থাৎ উঁচু জন্ম বা প্রজনন হার এবং নি¤œ মৃত্যুহার। যা দেশে বাড়তি লোক সংখ্যা জন্ম হওয়ার হুমকি। পক্ষান্তরে এতে দ্রæত হারে প্রাকৃতিক সম্পদের উপরে চাপ বাড়ে এবং এই সম্পদের ক্ষয় হতে থাকে। সামগ্রিক ভাবে এ জন্য আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ-সম্পদ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির’পরে অস্থিরতা প্রলেপ দেয়।
প্রকৃতিতে মানুষ হলো উন্নত বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণি। মানুষ প্রকৃতির অনেক প্রতিকূলতাকে জয় করেছে ¯্রফে নিজেদের প্রয়োজনে। প্রকৃতির অনেক রহস্যের নিগুঢ়তাকে জেনেছে। এ জন্য মানুষ প্রকৃতির সাথে সংগ্রাম করতে গিয়ে তার সাথে এক ধরণের সখ্যতা গড়তে সক্ষম হয়েছে। বলতে গেলে এই মানুষের প্রয়োজনে প্রকৃতির’পরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রতিবর্তী ঘটনার কারণে যেমন সমাজ সুষ্টি হয়েছে আবার যুক্ত সামাজিক ব্যবহারের ফলে প্রকৃতিকে যাচ্ছেতাই ভোগ করে চলেছে। আর প্রকৃতির রুষ্টতার কারণ ঠিক এখানেই। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, পৃথিবীতে যে বৈষয়িক পরিবর্তন তা মানুষের জন্য। এমন কি তার জন্য প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণিকূলের উপরে যে রুষ্টতা অথবা শান্তিময়তা তা মানুষের সাথে প্রকৃতির সম্পর্কের প্রভাব। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, আজকের প্রকৃতি আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য যথাযথ বাসযোগ্য হিসেবে রেখে যাওয়াও আমাদের এই প্রজন্মের মানুষের অঙ্গিকার। সে জন্য প্রকৃতির’পরে মানুষের প্রভাব, প্রকৃতিকে স্বাভাবিকতায় চলতে দিয়ে বিজ্ঞান-সমাজ এবং সম্পর্ক তৈরীর বিষয়টি এখনই ভাবতে হবে। শোষণ,বিস্তীর্ণ দূষণ, ক্রমক্ষয়িষ্ণুতা পরিহার করে পরিবেশকে সুসংহত করে, প্রকৃতিকে রক্ষা করা আমাদের প্রধান কাজ। নিয়তির জন্য আমাদের নিত্য প্রার্থনা হোক, প্রকৃতি, আমাদেরকে শান্তি দাও, অশান্তি দূর করে। যেন
‘ প্রকৃতি তুমি চিতার দাহিকায় ঝলসে গেলেও
আমার শিখায় ছড়াও তোমার ¯িœগ্ধ সবুজ আলো।’

লেখক:
প্রাবন্ধিক, উদ্ভাবক-গবেষক(জাবি,সাভার,ঢাকা) ও পরিবেশ ব্যক্তিত্ব (সরকারী খেতাব)।

Loading...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here